ছবি তোলা নিয়ে একটু ভাবি।

আমরা যখন কিশোর কিংবা তরুণ ছিলাম তখন বিয়েশাদি/ঈদ এগুলো ছিল আমাদের বহু প্রতীক্ষিত আনন্দ উৎসব। এগুলোতে আমরা কাজিনরা, বন্ধুরা একত্রিত হতাম।এদের অনেকেই অন্য শহরে থাকতো। সাধারণত দেখা হতো না। কেবল এসব উৎসব উপলক্ষ্যে দেখা হতো।তাই আমাদের কত অপেক্ষা! কখন এরকম একটা উৎসব আসবে।দেখা হলেই কত গল্প—স্কুল কিংবা কলেজে কী ঘটেছে?মোহামেডান- আবাহনী নিয়ে তর্ক।‘সাবিনা ইয়াসমিন অনেক ভাল গান—-‘আরেকজন থামিয়ে দিয়ে বলতো, না,না রুনা লায়লা।বনি এম শুনেছিস? কী সুন্দর—-দূর ‘আবা’ আরো অনেক বেশি জমাতে পারে।কাউকে কাউকে দেখতাম একটু উদাস।একটু সন্দেহ হতো।‘এই তোর কী হয়েছে?’ অনেক মোচড়ামুচড়ির পর সে সলাজ হেসে স্বীকার করতো, কার জন্য যেন খারাপ লাগছে।আমরা সবাই তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়তাম। আর সে গর্বিত হেসে বলতো—‘না, না, কসম, মাত্র পরিচয়, তাই আগে বলিনি।‘আবার আরেকজনের কাকে যেন ভাল লেগেছে, কাজ হচ্ছে না। আমরা সবাই বুদ্ধি বের করার কাজে নেমে পড়তাম কী করে সে অপরিচিতার মন ভজানো যায়।‘মাসুদ রানা’র লেটেস্টটা পড়েছিস???হা। যা লিখসে না? ভাই, রানার বান্ধবী সোহানারে এতো ভাল লাগে ক্যান??বুদ্ধিজীবী টাইপের কেউ গম্ভীর হয়ে বলতো, সমরেশের ‘কালবেলা’ পড়েছিস?তারপর হা হা, হি হি —-আহা, কী আনন্দ। কী বন্ধন!!এতো কথা লেখার কারণ হলো, আজকাল কোন অনুষ্ঠানে গেলে একই বয়সের ছেলেমেয়েদের দেখি নিজেদের ছবি তোলা নিয়ে ব্যস্ত। কোন আড্ডা নেই, জমিয়ে নিচু গলায় কারো ভালো লাগার ‘গুপ্ত’ গল্প নেই।কেবল ছবি তোলা হচ্ছে।করোনার আগে এক বিয়েতে খেতে বসেছি, পাশের টেবিলে এক তরুণী নিবিষ্ট মনে সেলফি তুলছে। অন্য চেয়ারে তাঁর বান্ধবীও তাই করছে। কোনো কথা নেই!যেন দুটো রোবটকে ছবি তোলার প্রোগ্রামিং ফিক্স করে দিয়ে বসিয়ে দেয়া হয়েছে।চোখ তুলে দেখি, সারা বিয়ে বাড়িতে কেবল ছবি তোলা হচ্ছে। বয়স্করাও ব্যতিক্রম নন। সবাই ব্যস্ত।এমন কী লাজনম্র বধু আর বরও স্টেজে নেই। এদিক ওদিক যুতসই লোকেশনে ছবি তোলায় ব্যস্ত।টেবিলে টেবিলে হোস্টদের ছুটে গিয়ে অতিথিদের খোঁজ নেয়ার যে একটা চমৎকার প্রথা ছিল সেটাও একদম মরে গেছে।আগে দেখতাম হোস্ট বারবার আসছেন, বলছেন, ভাইজান খাসির টুকরা আরেকটা নেন। আরে, ওই ভাইজানের তো পাতে তো কিচ্ছু নাই, এই বয়, উনারে রাইস দাও, রাইস—-তিনিও ধারেকাছে নেই।ছবি তুলছেন!!!!আমাদের আতিথেয়তার অপূর্ব ঐতিহ্য এক মৃত নির্জনতায় গায়েব হয়ে যাচ্ছে!!নৈঃশব্দের মধ্যে কেবল ছবি তোলার প্রাণহীন ক্লিক ক্লিক আওয়াজ।আমরা কি জানি, আঠারো শতকে ক্যামেরা আবিষ্কার হওয়ার পর ২০০০ সাল অব্দি সারা দুনিয়ায় যত ছবি তোলা হয়েছে, এখন প্রতি তিন সেকেন্ডে তারচে বেশি ছবি তোলা হয়?এ ব্যাপারটা কিন্তু মানসিকভাবে খুব খারাপ প্রভাব ফেলছে।কীভাবে—–?১। উঠতি বয়সের ছেলেমেয়েদের যখন অন্যকে নিয়ে ভাবার সময় শুরু হবে, তখন কিন্তু ছবি তোলার এই অতি প্রবণতা তাঁদের কেবল নিজেকে ভালবাসতে শেখাচ্ছে। সে নিজেকে শুধু বাহ্যিকভাবে সুন্দর করে তুলতে চাইছে। অন্তরকে সুন্দর করার ব্যাপারটা ভুলে যাচ্ছে।এটি কিন্তু আমার কথা না। মনোবিজ্ঞানীরাই একথা বলছেন।শুধু সেলফিই একজন মানুষকে যেভাবে আত্মপরতায় আক্রান্ত করতে পারে, তা অন্য কোনো কিছু খুব কম পারে।কারণ যখন একজন মানুষ অতি সেলফিতে মজে যায়, তার মানে সে নিজেতে মজলো। এটা ক্রমশ তার অন্যকে নিয়ে ভাবার ক্ষমতা নষ্ট করে দেয়।২। ছবি তোলার এ প্রবণতা আরেকটি ব্যাপার ভুলিয়ে দিচ্ছে। তাহলো, কেবল শারিরীক সৌন্দর্য আসলে সৌন্দর্য নয়। আসল ‘সুন্দর’ লুকিয়ে থাকে মনে। ছবি তো শরীরকে ফুটিয়ে তোলে, চেহারাকে ফুটিয়ে তুলে। তাই ছবির প্রতি বেশি ঝুঁকে পড়া মানে, শুধু চেহারার দিকে নজর দেয়া। মনের কর্ষণের ব্যাপারটা কিন্তু তাতে গৌণ হয়ে যায়। জ্ঞানের চর্চা হয় দূর অস্ত। এটা কিন্তু মোটেও ভাল ব্যাপার নয়।আচ্ছা, মহাত্মা গান্ধী, মার্টিন লুথার কিং কিংবা নেলসন ম্যান্ডেলার চে সুপুরুষ কি আর কেউ আছেন?কিংবা মাদার তেরেসার মত সুন্দরী আর কোন মহিলা??এরা কিন্তু চেহারায় তেমন সুন্দর ছিলেন না।৩। ছবি তোলার এ বাতিক মধ্যবিত্তদের অযথা খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে। যে পোশাকে একবার ছবি তুলে ফেইসবুকে দেয়া হচ্ছে, তা পরের ছবিতে পরা যাচ্ছে না। নতুন পোশাক কিনছেন সবাই। কী বাজে খরচ!!! পার্লারের খরচ তো আছেই।( আচ্ছা, আমার মেয়েরা কি জানে তারা হচ্ছে ‘ফুটন্ত গোলাপ’ এবং ফুটন্ত গোলাপের পার্লারে যাওয়ার দরকার হয় না, সে নিজের সৌন্দর্যেই দুনিয়া সেরা?)ছবি তোলার ব্যাপারে যারা তরুণ তাদের একটি কথা বলে শেষ করি— ছবি অবশ্যই তুলবে, কেন তুলবে না? এগুলোই তো স্মৃতি ধরে রাখবে। তবে ছবিতেই জানপ্রাণ সঁপে দেয়া যাবে না । এটা মনের ‘কুসুম’কে ধ্বংস করে দেয়। এজন্যই ‘পে ইট ফরোয়ার্ড’ এর কোনো কাজের ছবি পোস্ট করা নিষিদ্ধ।আর হ্যাঁ, সেটাই সেরা ছবি, যেটা তুমি তোলো না, যেটা আগ্রহ নিয়ে অন্য কেউ তোমার সাথে তোলে। তারপর বাড়িতে গিয়ে গল্প করে, দেখো, দেখো, আজ আমি ‘উনার’ সাথে ছবি তুলেছি—প্রিয় বাচ্চা আমার, আমি চাই তুমি সেই ‘উনি’ হও— অন্যরা তোমার ছবি তুলুক আর বাড়ি গিয়ে তার গল্প করুক।সে দিনটির জন্য তোমাকে অগ্রিম অভিনন্দন#আসুনমায়াছড়াই

বাদল সৈয়দ - Badal Syed

আর জে কিবরিয়া ভাইকে একটি ইন্টারভিউ দিয়েছিলাম।( Md Golam Kebria Sarkar ) সেটির মূল ভিডিওর ভিউ আজ চার মিলিয়ন ছাড়িয়ে গেলো। (একচল্লিশ লাখ।) এছাড়া এটি ছোট ছোট ক্লিপ করে নিজের পছন্দের অংশ ছেড়েছেন অনেকেই। আমার চোখে পড়া এরকম বিচ্ছিন্ন ক্লিপ দেখেছেন আরো প্রায় দশ লাখ মানুষ।এটির অডিও শুনেছেন আরো কয়েক লাখ শ্রোতা। আমার জীবনের অতি সাদামাটা গল্প যে এমন আলোড়ন তুলবে তা আমি কল্পনাই করিনি। এটা একদিকে আমাকে আনন্দিত করে, আবার একই সাথে বিপণ্ণও করে। কারণ পঞ্চাশ লাখের উপর মানুষ তাঁদের বিশ্বাসের ভার আমার কাঁধে তুলে দিয়েছেন- এ বোঝা বহন করা যে কতটুকু কঠিন আমিই শুধু তা বুঝি। ধন্যবাদ কিবরিয়া ভাই, আপনাকে ধন্যবাদ দেওয়া হয়নি। সেটা দেওয়া এ পোস্টের অন্যতম উদ্দেশ্য। সময় থাকতে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে ফেলা ভালো। কারণ পরের মুহূর্তটুকু আসলে আমাদের হাতে আছে কি না তা আমরা জানি না। ধন্যবাদ সবাইকে। #আসুনমায়াছড়াই