প্রাইভেট টিউটর- আমরা কেন গ্লোরিয়া ভাবির মতো হতে পারি না?

আমাদের এক শিক্ষার্থী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্সে বাংলায় প্রথম শ্রেনীতে তৃতীয় হয়েছে।
অতি প্রান্তিক পরিবারের এ ছেলেটি মোটামুটি স্বচ্ছল পরিবারে টিউশনি করতো। এ কারণে বৃত্তি নেওয়া বন্ধ করে দিয়েছিলো।
করোনার কারণে তা বন্ধ হয়ে গেছে।
অথচ এর মধ্যেই যাদের বাড়িতে পড়াতো তাঁরা নাকি গাড়িও কিনেছেন।
ছেলেটি চরম বিপদে, তাই সে তার বকেয়া বেতন চাইলো। উত্তর এলো, আরে মিয়া, দেশের কী অবস্থা জানেন না? আপনি চান বেতন, রাখেন টেলিফোন।
অদম্য এ ছেলে আপাতত গ্রামে কৃষিকাজে ফিরে গেছে। বিশ্ববিদ্যালয় খুললে আবার ফিরে আসবে।
‘পে ইট ফরোয়ার্ড ‘ তাকে সামান্য মূলধন দিয়েছে।

আমি তার আত্মমর্যাদাবোধকে স্যালুট জানাই।

এ ঘটনায় আমার নিজের কথা মনে পড়ে গেলো।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে আমি প্রচুর টিউশনি করেছি।ওটা দিয়েই মূলত নিজের খরচ চালিয়েছি। বাবা রিটায়ার করায় তাঁর কাছ থেকে টাকা নিতে খুব খারাপ লাগতো।
আমার মনে পড়ছে, ভার্সিটি থেকে প্রায় না খেয়ে ট্রেন ধরতাম টিউশনির জন্য। আমার পেটে আগুন জ্বলতো খিদায়।
তাই আমি টিউশনির বেতন না পাওয়ার কষ্ট বুঝি।
আমি খুব বুঝতে পারি, প্রায় খালি পেটে বাচ্চা পড়ানোর সময় পেট কীভাবে মোচড় দেয়।
কথা যেহেতু আসলো, একটা অভিজ্ঞতা শেয়ার করি।
আমি এক সময় জনপ্রিয় গায়ক শ্রদ্ধেয় নাসিম আলীর বড় ভাই এর ছেলেকে পড়াতাম।
সে পড়তো ইংলিশ মিডিয়ামে। তাই জুন মাসে প্রায় দুই মাসের জন্য স্কুল বন্ধ হয়ে যেতো। পড়াশুনাও। কারণ বার্ষিক পরীক্ষা শেষ।
তো, আমার ছাত্রের স্কুল বন্ধ হয়ে গেলো।
আমি পড়লাম মহা বেকায়দায়। কারণ এই দুই মাস আমার চলবে কীভাবে?
চিন্তায় আমি অস্থির।কারণ আমি বাবা থেকে পকেট খরচ জান গেলেও নেবো না। এ টিউশনির টাকাই আমার ভরসা।
খুব মন খারাপ করে দুমাসের জন্য টিউশনি বিরতি দিয়ে যখন চলে আসবো, তখন ভেতর বাড়ি থেকে বেড়িয়ে এলেন ছাত্রের মা। গ্লোরিয়া ভাবি।
তিনি একটি খাম এগিয়ে দিয়ে বললেন, বাদল, ছুটির দুমাসের বেতন।
আমি তো হতবাক!
কোনো রকমে বললাম,ভাবি, আমি তো এ সময় পড়াবোনা—
আমার কথা শেষ হওয়ার আগেই তিনি বললেন,তাতে কী? তাই বলে তো, আমার ছেলের প্রতি তোমার শিক্ষকতা তো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে না! রাখো তো টাকাটা।
আমার পরিষ্কার মনে আছে, সে বাড়ির সিঁড়ি ভেঙে নেমে আসার সময় আমার চোখে জল ছিল।
কৃতজ্ঞতার জল।
আমরা কেন ‘গ্লোরিয়া’ ভাবির মতো হতে পারিনা?
(যে সমস্ত অভিভাবক দুরাবস্থায় পড়েছেন, এ পোস্ট তাঁদের জন্য নয়, যারা পড়েননি তাঁদের জন্য। তাঁরাও নানা অজুহাতে প্রাইভেট টিউটরদের সম্মানী দিচ্ছেন না বলে খবর পাচ্ছি।)

#আসুনমায়াছড়াই
কপিরাইট: বাদল সৈয়দ।

বাদল সৈয়দ - Badal Syed

আর জে কিবরিয়া ভাইকে একটি ইন্টারভিউ দিয়েছিলাম।( Md Golam Kebria Sarkar ) সেটির মূল ভিডিওর ভিউ আজ চার মিলিয়ন ছাড়িয়ে গেলো। (একচল্লিশ লাখ।) এছাড়া এটি ছোট ছোট ক্লিপ করে নিজের পছন্দের অংশ ছেড়েছেন অনেকেই। আমার চোখে পড়া এরকম বিচ্ছিন্ন ক্লিপ দেখেছেন আরো প্রায় দশ লাখ মানুষ।এটির অডিও শুনেছেন আরো কয়েক লাখ শ্রোতা। আমার জীবনের অতি সাদামাটা গল্প যে এমন আলোড়ন তুলবে তা আমি কল্পনাই করিনি। এটা একদিকে আমাকে আনন্দিত করে, আবার একই সাথে বিপণ্ণও করে। কারণ পঞ্চাশ লাখের উপর মানুষ তাঁদের বিশ্বাসের ভার আমার কাঁধে তুলে দিয়েছেন- এ বোঝা বহন করা যে কতটুকু কঠিন আমিই শুধু তা বুঝি। ধন্যবাদ কিবরিয়া ভাই, আপনাকে ধন্যবাদ দেওয়া হয়নি। সেটা দেওয়া এ পোস্টের অন্যতম উদ্দেশ্য। সময় থাকতে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে ফেলা ভালো। কারণ পরের মুহূর্তটুকু আসলে আমাদের হাতে আছে কি না তা আমরা জানি না। ধন্যবাদ সবাইকে। #আসুনমায়াছড়াই